শফিকুল ইসলাম যশোর থেকে:
কুষ্টিয়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ—দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যশোর উপশহর বি ব্লকে গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকার বিলাস বহুল ৭তলা আলীশান বাড়ি। এছাড়া গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে, রাজধানী ঢাকায় এবং যশোর উপশহর সারথী মিল এলাকায় রয়েছে আরও কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। দুদকের হাত থেকে রক্ষা পেতে সুকৌশলে নামে—বেনামে গড়ে তোলা হয়েছে এসব সম্পদ। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ ও একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে শহিদুল ইসলাম সাতক্ষীরা জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন তিনি। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রকাশিত হলেও অজ্ঞাত কারণে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। পক্ষান্তরে তিনি অবাধে দুর্নীতি করতে উৎসাহিত হয়েছেন। সাতক্ষীরা থাকাকালীন তিনি ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লকের কাজ অবৈধভাবে যশোরের বিরামপুরের সাইফুল নামের একজন সাব ঠিকাদারকে দিয়ে করান। ৬টি ওয়াশ ব্লক কাজের মধ্যে দুটি কাজ সম্পন্ন করেন এবং একটি কাজ অর্ধেক করেন আর বাকি ৩টি কাজ সম্পন্ন না করেই সমুদয় বিল তুলে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার ড্রপিংয়ে এই ৬টি প্যাকেজের কাজ পেয়েছিলেন মেসার্স রাজ্জাক কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, সাতক্ষীরা থাকাকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম কয়েকজন ঠিকাদারের সাথে গোপন আতাঁত গড়ে তুলে দরপত্রের গোপনীয়তা ফাঁস করে পছন্দের লোককে কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন।
বিশ^স্ত একাধিক সূত্র জানায়, পিতা আব্দুর রউফ ছিলেন একজন সাবেক বন বিভাগের অফিসার। তিনি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালে আব্দুর রউফের নাম মুক্তিযোদ্ধার গেজেটে না থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন শহিদুল ইসলাম। তার পিতার গেজেট প্রকাশ হয় ২০১৬ সালে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপদেষ্টা ও সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকলেও বিশেষ কারণে অদ্যাবধি পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে তদন্ত কিংবা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ভুক্তভোগী মহল হতবাক হয়েছেন। পিতার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামসহ তিন ভাই অবৈধভাবে ঢুকেছেন চাকুরীতে। গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা, পতিত স্বৈরাচার সরকারের মদদপুষ্ট আওয়ামী দালাল শহিদুল ইসলাম এখন কুষ্টিয়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম কুষ্টিয়ায় যোগদানের পর পরই তিনি সেখানকার কয়েকজন ঠিকাদারের সাথে গোপন অঁাতাত গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যে অবৈধভাবে টেন্ডার বাণিজ্যের সিন্ডিকেট সেখানে গড়ে তুলেছেন তিনি। এমন বহু অভিযোগ করেছেন ওখানকার ঠিকাদাররা। দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক অতি গোপনে তদন্ত করলে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভুত কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজে পাবে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছেন। কুখ্যাত দুর্নীতিবাজ শহিদুল ইসলাম কোন প্রকার নিয়মনীতি ও আইনের তোয়াক্কা না করেই ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে খেয়াল—খুশিমত নিজের পছন্দের কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ঠিকাদার নির্বাচনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি সাতক্ষীরায় দায়িত্ব পালনকালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ২শ’ কোটি টাকা নয় ছয় করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে সাতক্ষীরায় থাকাকালীন, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম নিজে সকল দরপত্র ওপেনিং ও মূল্যায়ন করতেন, যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সিপিটিইউ নিয়মের পরিপন্থী। যে কারণে এপ্রিল ২০২২ হতে সেপ্টেম্বর ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২শ’ কোটি টাকার কাজে তিনি নয় ছয় করেছেন বলে স্থানীয় ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছেন।
সূত্রগুলো আরও জানায়, শহিদুল ইসলাম নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সাতক্ষীরা কার্যালয়ে ১৫ মে ২০২১ সালে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে যশোরে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। ঠিকাদারদের অবৈধভাবে কাজ দিয়ে তিনি ৩% থেকে ৫% টাকা নিতেন। আবার কখনো ঠিকাদারদের অবৈধভাবে কাজ দিয়ে নির্ধারিত রেটে ঘুষ নিতেন। এস্টিমেটর ইসতিয়াক আহম্মেদ বদলী হয়ে কয়রা উপজেলা খুলনাতে যোগদান করেন ৯ জুন ২০২২ সালে। ইসতিয়াক চলে যাওয়ার ১৫ মাস পরেও তাকে টেন্ডার ওপেনিং কমিটির সদস্য সচিব করে তার স্বাক্ষর জাল করে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম নিজে কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ১৮টি টেন্ডার ওপেনিং করেছেন। ইসতিয়াক আহমেদ এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় ঠিকাদার অভিযোগ করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম পিপিআর আইন ২০০৬ ও বিধি ২০০৮ এর তোয়াক্কা না করে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ তছরুপ করেন।
সাতক্ষীরায় থাকাকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ঠিকাদার কর্তৃক সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো অভিযোগপত্রে বিভিন্ন টেন্ডারের অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রকল্প ও টেন্ডার আইডি নম্বর হলো— সমগ্র দেশ প্রকল্পের টেন্ডার আইডি নং—৮৫৬৮৪০, ৮৫৬৮৫৪, ৮৫৬৮৫৯, ৮৫৬৮৬১, ৮৫৬৮৬২, ৮৫৬৮৬৩, ৮৫৬৮৬৬, ৮৫৬৮৬৮, ৮৫৬৮৬৯, ৮৫৬৮৭০, ৮৫৬৮৭১, ৮৫৬৮৭৩; পিইডিপি—৪ প্রকল্পের টেন্ডার আইডি নং—৮৪৬৭০১, ৮৪৬৭০২, ৮৪৬৭০৪, ৮৪৬৭০৬, ৮৪৬৭০৭; উপকুলীয় প্রকল্পের টেন্ডার আইডি নং—৮৫৫৪২২, ৮৫৫৪২৪, ৮৫৫৪২৭, ৮৫৫৪২৯; জিপিএস ও এনএনজিপিএস প্রকল্পের আওতায় টেন্ডার আইডি নং—৬৬৮৭৮৮ ও ৬৬৮৭৮৯।
নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হলো, সাতক্ষীরায় থাকাকালীন ২টি প্যাকেজে ৫০টি করে টিএসপি এর দরপত্র আহবান করা হয়। এর ২টিতে মেসার্স রব এন্টারপ্রাইজ সর্বনিম্ন দরদাতা নির্ধারিত হয়। এর ১টি কাজ রব এন্টারপ্রাইজকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে কোন অভিজ্ঞতা সনদ ছাড়াই দেয়া হয়, যার আইডি নং—৬৬৮৭৮৯।
সমগ্র দেশ প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ৮৩টি করে ২টি প্যাকেজে মোট ১৬৬টি সাব মার্সিবল নলকুপের কাজ মেসার্স রব এন্টারপ্রাইজকে কোন প্রকার অভিজ্ঞতা সনদ ছাড়াই ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়। যার টেন্ডার আইডি নং— ৭২১২৪৩ ও ৭২১২৪৪। মালামাল সাপ্লাইয়ে বি—ক্যাটাগরির লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ বেআইনিভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম মেসার্স সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজকে ২টি প্যাকেজে মালামাল সাপ্লাইয়ের কাজ প্রদান করেন, যার আইডি নং—৯২৭৭৪৩ ও ৯২৭৭৪৪ ।
সমগ্র দেশ প্রকল্পের আওতায় ১৩০টি আরডব্লিউএইচ এর দরপত্র সিডিউল বিক্রির শেষ সময়ের পূর্বে টেন্ডার সিকিউরিটি সাবমিশনের সময় নির্ধারণ করে দরপত্র আহবান করা হয়, যাতে তার পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ অংশগ্রহণ না করতে পারেন। যার আইডি নং—৭২৩৯১০। জিসিএ নামে একটি প্রকল্পের কাজ কোন অভিজ্ঞতা সনদ ছাড়াই মেসার্স জাহাঙ্গীর ট্রেডার্সকে দেয়া হয়, যার আইডি নং—৬৩৩৪৪১। এভাবে সাতক্ষীরা জেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে শহিদুল ইসলাম নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করেন বলে বহু অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত হলে এসব অভিযোগের সত্যতা মেলবে বলে ঠিকাদার ও ভুক্তভোগী সূত্রগুলো দাবি করেছেন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বক্তব্য নেয়ার জন্যে ফোন করলে সাংবাদিক পরিচয় জানা মাত্র তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা এ ব্যাপারে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
Please follow and like us: